Monday, May 28, 2012

বিরিঞ্চিবাবা


কাওরানবাজার এলাকায় তিনিই সূর্যোদয় ঘটাইয়া থাকেন।

কর্মবীর পুরুষ তিনি। তাঁহার জাগরূক কাল সম্পূর্ণ ব্যয় হয় কামের চিন্তায়। তাই অতি প্রত্যূষে নগরীর অনিবার্য যানজট বাঁধিবার পূর্বেই তিনি আপিসে স্বীয় কক্ষে ও মহাজগতে স্বীয় কক্ষপথে অবস্থান গ্রহণ করেন। বেয়ারা আসিয়া একটি ঝকঝকে গেলাসে পানীয় জল ও তশতরিতে মিষ্টান্নাদি রাখিয়া দরজায় স্বয়ংক্রিয় ছিটকিনিটি টিপিয়া দুয়ার আঁটিয়া কাটিয়া পড়ে। কিয়ৎকাল পরই তাহার মন্দ্রস্বর ছড়াই পড়ে সমগ্র আপিসে। কাওরানবাজার এলাকায় ঊষাকালে সক্রিয় সকলেই শুনিতে পায় তাহার সেই প্রলম্বিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মহানাদ, "ওঠ!"

"ওঠ!"

"ওঠ!"

সূর্য উঠিয়া পড়ে।

সারাটি দিন আপিসের নানা কর্মাদির যজ্ঞে ঘৃত ঢালিয়া, দূরালাপনীতে ইহজাগতিক নানা দুরুশ্চার্য আলাপ সারিয়া, বৈকালিক ধ্যানে বসিবার পূর্বে তিনি বেয়ারাকে গলা খাঁকরাইয়া পুনর্বার ডাকেন। বেয়ারা আসিয়া দরজায় ছিটকিনি টিপিয়া দুয়ার আঁটে।

কাওরানবাজারের ব্যস্ত সড়কে শকটাদির মুহুর্মুহু আর্তনাদ ছাপাইয়া আবারও শ্রুত হয় তাহার মহামন্ত্র, "ওঠ!"

"ওঠ!"

"ওঠ!"

চন্দ্র উঠিয়া পড়ে তাহার ভগ্নাংশ সম্বল করিয়া।

পর্বতারোহী মূষা ব্রহ্ম টিসু কাগজে আঁসু মুছিয়া কাগজে লিখিলেন, ভাই সাহেবের দোয়া মাঙিতে গিয়াছিলাম। গিয়া দেখি দরজা বন্ধ। এক ঘন্টা কাটিল, দুই ঘন্টা কাটিল, দরজা আর খোলে না। দরজায় করাঘাতের সাহস আমার হয় নাই। ভয়ে ভয়ে তাহার নিষ্প্রাণ কাষ্ঠের বুকে কান পাতিয়া শুনিলাম, ভাই সাহেব ভূলোক দ্যূলোক গোলক ভেদিয়া খোদার আসন আরশ ছেদিয়া বলিতেছেন, "ওঠ! ওঠ!" হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত ধারে, কী যে এক ঢেউ উঠিল ভক্তির তুফানে! তৎক্ষণাৎ বাহির হইয়া পড়িলাম। আমাকে উঠিতে হইবে। ফকিরাপুলের জলাধার হৌক আর ইভাহৃষ্ট পর্বত, আমাকে উঠিতেই হইবে। ভাই কহিয়াছেন ওঠ। আমি উঠিবই। উঠিতে না পারিলে ফটোশপ ব্যবহার করিব।

কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, স্তম্ভলেখক, পর্বতারোহী সংগঠনের সভাপতি, বিজ্ঞাপক ও লুঙ্গিপরিধায়ক সাংবাদিকটি পার্শ্ববর্তী আগন্তুককে জড়াইয়া ধরিয়া হাপুস কাঁদিয়া কহিলেন, এখন আমার বেলা নাহি আর বহিব একাকী হৃদয়ের ভার। গিয়াছিলাম ক্রীড়াক্ষেত্রে, ক্রিকেটযুদ্ধ অবলোকনে। আমাদের তামিম, আমাদের সাকিব, গরিব মায়ের গরিব ছেলেগুলি, দুবেলা দুমুঠো ভক্ষণ করিতে পায় কি পায় না, কেমন করিয়া দখিনে বামে চতুষ্ঠী ষষ্ঠী হাঁকড়াইতেছে গো! আবেগে আমার কুক্ষিদেশ মোচড় মারিয়া উঠিল। আমি মুষ্ঠিফোন তুলিয়া ভাই সাহেবকে মারিলাম ফোন। ভাইসাহেব ফোন ধরিলেন না প্রথমে। পাঁচ মিনিট কাটিল, দশ মিনিট কাটিল, তারপর ফোন ধরিয়া শুধু কহিলেন, "ওঠ!" আমি নিজে তো উঠিলামই, গোটা গ্যালারি উঠিল, উঠিয়া নর্তন করিতে লাগিল। ওগো তোমরা আমায় মাধবদী হইতে একটি গামছা কিনিয়া দাও, এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে?

এমনি করিয়া নগরের সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করিল, তিনিই আজকাল চন্দ্রসূর্য চালাইতেছেন, নিম্নকে উচ্চে উঠাইতেছেন। সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় কোন নালায়েক জোর করিয়া সিটে বসিয়া থাকিলে শোনা যায় তাহার দূরাগত হুহুঙ্কার, ওঠ! বসুন্ধরার বুক বসুন্ধরা কর্তৃক জবরদখলকৃত হইলে শোনা যায় তাহার পরিত্রাণমন্ত্র, ওঠ! ফুটপাথ জবরদখলকারী হকার, ঝোপের গহীন কন্দরে ঘনিষ্টতালোভী যুগল, ট্যাঙ্কের পাদানিতে দ্বিধাগ্রস্ত জেনারেল, সকলেই এক বাক্যে তাহার ধমকে উঠিয়া পড়ে।

ওঠে না শুধু তাহার বিরিঞ্চিবাবাটি। আর ল্যাপটপের পর্দায় পুনম পাণ্ডে মিটিমিটি দুষ্ট হাসি হাসে, বছরের পর বছর।